কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি:
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার খারনৈ ইউনিয়নে মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার পর এক মাওলানা ও তার পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাণনাশ ও সম্মানহানির আশঙ্কায় তিনি এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২৯ মে শুক্রবার খারনৈ ইউনিয়নের উত্তর রানীগাঁও গ্রামের মাওলানা শফিকুল ইসলামের বাড়ির পেছনে একটি ব্যাগে সন্দেহজনক মাদকদ্রব্য দেখতে পান তার ছোট বোন হাফসা খাতুন হাফিজা। পরে বিষয়টি তিনি তার ভাইকে জানালে মাওলানা শফিকুল ইসলাম কলমাকান্দা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল্লাহ আল নোমানকে অবহিত করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ওই তথ্যের ভিত্তিতে এসআই নোমানের নেতৃত্বে একদল পুলিশ রাতেই অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে উত্তর রানীগাঁও এলাকার একটি পুকুরপাড় থেকে ভারতীয় তৈরি পাঁচ বোতল ভদকা উদ্ধার করা হয়। এ সময় মাদক বহন ও বিক্রয়ের অভিযোগে ফাহিম মিয়া (১৬) ও হাসান (১৬) নামে দুই কিশোরকে আটক করা হয়। তবে অভিযুক্ত হৃদয় (১৭) পালিয়ে যায় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় এসআই আব্দুল্লাহ আল নোমান বাদী হয়ে কলমাকান্দা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে আটক দুই কিশোর ও পলাতক হৃদয়কে আসামি করা হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, অভিযানের পর থেকেই মাওলানা শফিকুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। এমনকি তার ছোট বোনকে সম্মানহানির হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
মাওলানা শফিকুল ইসলামের ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, পুলিশকে তথ্য দেওয়ার বিষয়টি গোপন থাকার কথা থাকলেও কোনোভাবে সেই তথ্য অভিযুক্তদের কাছে পৌঁছে যায়। এরপর থেকেই তাকে লক্ষ্য করে হুমকি ও চাপ সৃষ্টি শুরু হয়। নিরাপত্তার অভাবে বর্তমানে তিনি এলাকায় অবস্থান করছেন না বলেও জানা গেছে।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত হৃদয়কে একপর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে কোনো এর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খারনৈ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি গেদু মিয়া বলেন, “আমার ছেলে অসুস্থ। সে দৌড়ে পালিয়ে গেছে বলে শুনেছি। এসব অভিযোগ পরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্রমূলক। আমাকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। মাওলানা শফিক তো বাড়িতেই থাকে না, তাকে আমি কেন হুমকি দেব? আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
তথ্যদাতার পরিচয় ফাঁস হওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কলমাকান্দা থানার এসআই আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, “তথ্যদাতার পরিচয় প্রকাশের কোনো ঘটনা ঘটেনি। মাওলানা শফিকুল ইসলামের বাড়ির পেছন থেকে মাদক উদ্ধার করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থল থেকে দুইজনকে আটক করা হয়েছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। একজন পালিয়ে যায়, পরে আটককৃতদের তথ্যের ভিত্তিতে তার নাম হৃদয় বলে জানতে পারি। মাদক উদ্ধারের ঘটনাটি হুজুরের বাড়ির আশপাশে হওয়ায় অনেকে হয়তো তাকে নিয়ে সন্দেহ করছে। তবে তথ্য ফাঁসের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।”
তিনি আরও বলেন, “হুমকির বিষয়ে থানায় এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় আটক ফাহিম মিয়া ও হাসানের পাশাপাশি পলাতক হৃদয়কে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
মঙ্গলবার রাতে এ বিষয়ে কলমাকান্দা থানার ওসি (তদন্ত) সজল সরকার বলেন, “এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি আমরা শুনেছি। অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় পুলিশ পাঠানো হবে এবং কেউ যদি হুমকি বা হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ মামলার অন্যতম সাক্ষী ও জব্দ তালিকার সাক্ষী তাজুল ইসলামের বড় ভাই মাওলানা শফিকুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে আমি গাজীপুরের মাওনা এলাকায় একটি মসজিদে ইমামতি করছি। সাম্প্রতিক হুমকির কারণে ঈদের পরও বাড়িতে আসতে সাহস পাচ্ছি না। আমি প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছি। এখন আমার ও আমার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচার চাই।”
ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, একজন তথ্যদাতার পরিচয় কীভাবে অভিযুক্তদের কাছে পৌঁছাল, সেটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তারা মাওলানা শফিকুল ইসলাম ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর মতে, মাদকবিরোধী কার্যক্রমে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হলে তথ্যদাতা ও স্থানীয় সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দিতে আগ্রহী হবে না।
এ বিষয়ে নেত্রকোনা জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগকারী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
রাকিব হাসান
কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি
মোবাইল : ০১৩১২৫৫৩১৫০
তারিখ : ০২.০৬.২০২৬ খ্রি:
সম্পাদক - মোঃ মনির হোসেন