তৌফিকুর রহমান তাহের
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
বর্তমান সমাজে যেন এক অদ্ভুত ও বিকৃত সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। যেখানে সততা আর নৈতিকতা কোণঠাসা, সেখানে সমাজের বড় বড় আসনগুলো আজ যেন সুদখোর আর ঘুষখোরদের দখলে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি সেক্টরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ দিবালোকে প্রকাশ্যে চলছে অনিয়ম আর দুর্নীতির এই মহোৎসব। সাধারণ মানুষ আজ কোথাও নিরাপদ নয়—না ঘরে, না হাসপাতালের বারান্দায়।
সম্প্রতি চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে এক হতদরিদ্র মানুষের মুখে উঠে এসেছে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও সমাজের এই পচে যাওয়া রূপের জীবন্ত এক খতিয়ান।
সুদের বোঝা আর ঘুষের হুলিয়া
হাসপাতালের করিডোরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অসহায় মানুষ তার জীবনের চরম তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। হসপিটালে রোগীর চিকিৎসার তাগিদে নিরুপায় হয়ে চড়া সুদে টাকা ধার করতে হয়েছে তাকে। তিনি বলেন, *সময়মতো সুদের টাকা দিতে না পারলে কপালে জুটবে চরম অপমান আর লাঞ্ছনা। সেই অপমান মাথায় নিয়ে হসপিটালে এলাম একটুখানি স্বস্তির খোঁজে। কিন্তু এখানে এসে দেখি আরেক নরক! টাকা না দিলে এখানে কোনো সুযোগই পাওয়া যায় না। ঘাটে ঘাটে ঘুষ, পদে পদে অবহেলা।"*
সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের নানা রকম বুকভরা নীতিমালা ও বড় বড় প্রতিশ্রুতির কথা কাগজে-কলমে থাকলেও, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। নীতিমালার বেড়াজালে কেবল সাধারণ ও দরিদ্র রোগীরাই পিষ্ট হচ্ছে, সুবিধাভোগীরা পার পেয়ে যাচ্ছে অনায়াসে।
অপারেশন হবে সন্ধ্যায়, ডাক্তার আসেন মাঝরাতে'
বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চরম অব্যবস্থাপনা আর চিকিৎসকদের গাফিলতি নিয়ে ভুক্তভোগীদের ক্ষোভের শেষ নেই। অনেক সময় ডাক্তাররা 'সন্ধ্যায় অপারেশন হবে' বলে রোগীকে আশ্বস্ত করে যান। কিন্তু সেই সন্ধ্যার অপারেশন করতে করতে ঘড়ির কাঁটা পেরিয়ে যায় রাত বারোটা।
ততক্ষণ পর্যন্ত প্রাইভেট প্র্যাকটিস, চেম্বার কিংবা অন্য কোনো বাণিজ্যিক কাজ শেষ করে তবেই ডাক্তারবাবুর দেখা মেলে হাসপাতালে।
ফ্লোরে বসে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে অসহায় মানুষ
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায় হাসপাতালের ফ্লোরগুলোতে। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে হাড়ভাঙা খাটুনি আর শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে আসা অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনরা মেঝেতে বসে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। ডাক্তার কখন আসবেন, কখন তাদের একটুখানি দেখা মিলবে—এই চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় কাটে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
তাদের মুখের দিকে তাকালে কেবলই চোখে পড়ে সীমাহীন অসহায়ত্ব, ভয় আর একরাশ হতাশা। রাষ্ট্র বা সমাজের কাছে যেন তাদের কোনো অধিকারই নেই।
নেটিজেনদের প্রশ্ন: এর অবসান কবে?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ ও সচেতন নেটিজেনরা। হসপিটালের এই অমানবিক পরিবেশ এবং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া ঘুষ-সুদের এই মরণব্যাধি থেকে কবে মুক্তি মিলবে—এখন সেটাই সবার বড় প্রশ্ন।
সাধারণ মানুষের আকুল আর্তনাদ—আমরা কি তবে এভাবেই জিম্মি হয়ে থাকব? এই অনিয়মের অন্ধকার দূর করে কবে ফিরবে মানবিকতা ও সুচিকিৎসার সুদিন?
সম্পাদক - মোঃ মনির হোসেন