
মেহেদী হাসান আরফাত
টেকনাফ উপজেলা প্রতিনিধি:
নাফ নদীর গভীরে এবং জালীয়ারদ্বীপে টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি) দীর্ঘ ১৬ ঘন্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানঃ তিন জন মাদক পাচারকারীসহ ৯৪,০০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার।
টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি) গত ২১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ পেশাদারিত্ব, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দুর্দান্ত সাহসিকতায় একটি মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযানে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে নাফ নদী ও এর তীরবর্তী অঞ্চলে অপরাধের যে বিষদাঁত প্রোথিত তা থেকে বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলটি ধীরে ধীরে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, মাদক চোরাচালান ও মানব পাচারের এক অন্ধকার অভয়ারণ্যে পরিণত হবার শঙ্কা তৈরি হয়। ফলে, এই বিষদাঁত ভেঙে দেওয়াই ছিল আমাদের প্রতিজ্ঞা। তাই, এই এলাকাকে সুরক্ষিত করতে এবং অপরাধীদের নিস্ক্রিয় করতে বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ২টি নতুন ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করা হচ্ছে। এছাড়াও, এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জালিয়ারদ্বীপে একটি টিওবি (Temporary Observation Post) স্থাপন করা হয়েছে। বিজিবি’র এই কঠোর ও দৃঢ় অবস্থানের প্রতিফলন হলো গত ২১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের প্রথম প্রহরে প্রযুক্তি ও মানব সম্পদের নিখুঁত সমন্বয়ে পরিচালিত দীর্ঘ ১৬ ঘন্টার রুদ্ধশ্বাস অপারেশন।
আনুমানিক ভোর ০৪০০ ঘটিকায়, যখন চারদিকে শুধু গভীর অন্ধকার, ঠিক তখনই আমাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির চোখে মায়ানমারের দিক থেকে নাফ নদী দিয়ে সাঁতরে আসা দুই সন্দেহভাজনের গতিবিধি ধরা পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে সীমান্তে মোতায়েন আভিযানিক দল অত্যাধুনিক নৌ পেট্রোল ক্রাফট দ্বারা ক্ষিপ্রতার সাথে দ্রুত অ্যাকশনে যায়। এ সময় জালিয়ার দ্বীপের কাছাকাছি অংশের মাঝ নদীতে ৪৪,০০০ পিস ইয়াবাসহ একজন পাচারকারীকে মোঃ ইব্রাহিম(১৮), পিতাঃ নুর মোহাম্মদ, গ্রাম-পেরাম-প্রু, থানা-মংন্ডু, দেশ-মায়ানমারকে আটক করা হয়। কিন্তু অপরজন কৌশলে দ্বীপের গহীনে কেওড়া জঙ্গলে ঢুকে আত্মগোপন করে। কিন্তু আমাদের অভিযান থেমে থাকেনি, চৌকস সদস্যদের দ্বারা বেশ কিছু অভিযান দলকে নাফ নদীতে এবং দ্বীপের গহীন জঙ্গলে মোতায়েন করা হয়। অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে আধুনিক প্রযুক্তি, কৌশল ও চরম ধৈর্য্যের সাথে পুরো দ্বীপটিকে ঘিরে রেখে দীর্ঘ সময় ধরে চলে চিরুনি তল্লাশি। অবশেষে, পলাতক মাদক কারবারী মোঃ জুনায়েদ(১৫), পিতাঃ নবী হোসেন, গ্রামঃ সোয়ে জার, জেলা-মংন্ডু, দেশ-মায়ানমার এবং মাদকের জন্য লুকিয়ে থাকা আরেক পাচারকারীকে আব্দুর রাজ্জাক(২০), পিতা-মৃত-হোসেন, গ্রাম-কেরানতলি, ৯ নং ওয়ার্ড, টেকনাফ ইউনিয়ন, থানা- টেকনাফ, জেলা- কক্সবাজারকে আটক করা সম্ভব হয়। দিনের শেষে, সর্বশেষ আটককৃত আসামির দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে, সন্ধ্যা আনুমানিক ১৮৩০ ঘটিকায় জালিয়ার দ্বীপের গহীন কেওড়া বাগানের ভেতরে গর্ত করে লুকিয়ে রাখা আরও ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) পিস ইয়াবা মাটির নিচ থেকে খুঁড়ে বের করা হয়। সর্বশেষ রাত্রি ২০০০ ঘটিকায় অভিযান সমাপ্ত হয়। আমাদের এই দীর্ঘ ১৬ ঘন্টার অভিযান প্রমাণ করে টেকনাফ ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের এক ইঞ্চি জায়গাও কোন অপরাধীর জন্যই নিরাপদ নয়।
আমরা জানি, এই মাদকের অর্থ সরাসরি আঞ্চলিক সংঘাত, চোরাচালান এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হয়। এই বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করার মাধ্যমে টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি) কেবল দেশের আগামী প্রজন্মকেই নয়, বরং সীমান্ত সংঘাতের অর্থায়নের মেরুদণ্ডেও তীব্র আঘাত হানল। এই দুঃসাহসিক অপারেশনে ৩ জন আসামিসহ মোট ৯৪,০০০ (চুরানব্বই হাজার) পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে। চলমান তদন্তে উক্ত মাদকের ডিলার মোঃ জয়নাল ও মোঃ রফিকের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে এবং তাদেরকে আটক করতে তৎপরতা চলছে। মাদক কারবারীকে আটকের জন্য তল্লাশি অভিযান পরিচালনাকালে গত ২১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ আনুমানিক ২৩৪৫ ঘটিকায় টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের হাবিরছড়া ব্রিজের ওপর অস্থায়ী চেকপোস্টে ০১টি ইয়ামাহা আরওয়ান ফাইভ মোটরসাইকেলের ভিতরে লুকিয়ে রাখা ১২০ পিস ইয়াবাসহ ০১ জন আসামী মোঃ আরিফ (২৫), পিতা- ফরিদ আলম, গ্রামঃ দঃ রেমালিয়ারছড়া পূর্ব, পোঃ+থানা+জেলা- কক্সবাজারকে আটক করা হয়। বর্তমানে, জব্দকৃত ইয়াবা ট্যাবলেটসহ আসামীদেরকে যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়ায় টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তরের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ, টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি) শুধু মাদকের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশের চলমান গৃহযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও এই সীমান্তকে দৃঢ়তার সাথে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সুরক্ষিত জনপদের দৈনন্দিন জীবনকে নিরুদ্দুপ রাখতে সমর্থ হয়েছে। নজরদারি ও পেশাদারিত্বের এমন নজির বিশ্বের অন্য কোনো সংঘাতপূর্ণ সীমান্তে বিরল। এছাড়াও, আমাদের মানবিক প্রতিজ্ঞার যায়গা থেকে মানব পাচারের বিরুদ্ধেও সমানভাবে লড়ছি এবং বহু অসহায় মানুষের জীবন রক্ষায় সমর্থ হয়েছি। “সাম্প্রতিক সময়ে অর্জিত অসংখ্য সাফল্যের ফলে আজ স্থানীয় জনমনে টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (২ বিজিবি) প্রতি গভীর আস্থা তৈরি হয়েছে। টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি) ভবিষ্যতেও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাবে। আমরা দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলতে চাই দেশের প্রতি আমাদের প্রতিজ্ঞা ও নিবেদন প্রশ্নাতীত।” উল্লেখ্য যে, গত জানুয়ারী-২০২৫ হতে অদ্যবধি টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি) কর্তৃক টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে ১২৩জন আসামীকে আটক করতঃ মানব পাচারে ভূক্তভোগী ২৮৫ জনকে উদ্ধার করা হয় এবং ১৭৪,১৭,২৪,৫৪৬/- টাকার বিভিন্ন প্রকার মাদক ও মালামাল আটক করা হয়। তন্মেধ্যে ইয়াবা ট্যাবলেট ৫১,৪৫,৪১২ পিস, ক্রিস্টাল মেথ আইস ২.৯৪৬ কেজি, দেশি-বিদেশী ১৫টি আগ্নেয়াস্ত্র, হাত বোমা-৬৯ টি জব্দ করা হয়।
সীমান্তাঞ্চলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিজিবি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছে। সীমান্ত এলাকায় মাদক, মানব পাচারসহ সকল আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে বিজিবি’র এই বলিষ্ঠ ও কার্যকর ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।

অনলাইন ডেস্কঃ 

















