
ফাহিম উদ্দিন,পানছড়ি প্রতিনিধিঃ-
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ মোহাম্মদপুর–বাজার সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য ২ দশমিক ৩৫০ কিলোমিটার সড়কে সরকারি মানদণ্ড উপেক্ষা করে নিম্নমানের ইটের খোয়া ও রাবিশ ব্যবহার করে পিচ ঢালাই করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে কাজ বন্ধে বাধা দিলে এলাকাবাসীর সঙ্গে ঠিকাদারপক্ষের হাতাহাতি পর্যন্ত গড়িয়েছে।
১০ জানুয়ারি ২০২৬, শনিবার স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে শুরু থেকেই একটি দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী মতিয়ারকে ম্যানেজ করেই নিম্নমানের কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল (এলজিইডি) অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে মোহাম্মদপুর মসজিদ সংলগ্ন এলাকা থেকে পানছড়ি বাজার পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের কাজ পায় মেসার্স কবি রঞ্জন (খাগড়াছড়ি)। তবে অভিযোগ রয়েছে, মূল ঠিকাদার নিজে কাজ বাস্তবায়ন না করে নিয়মবহির্ভূতভাবে জাহাঙ্গীর আলম নামের এক ব্যক্তির কাছে কাজটি বিক্রি করে দেন। এতে করে প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করার দায়বদ্ধতা কার্যত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সাব-ঠিকাদার জাহাঙ্গীর আলম সড়কের মেকাডম যথাযথভাবে পরিষ্কার না করেই রাবিশ ও নিম্নমানের ইটের খোয়া দিয়ে পিচ ঢালাইয়ের কাজ শুরু করেন। মেকাডমের ওপর সরাসরি পিচ ঢেলে সিলেটি পাথর ছিটিয়ে কার্পেটিং করা হচ্ছে, যা প্রকৌশলগতভাবে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
এলাকাবাসীর বাধার মুখে একপর্যায়ে কাজ বন্ধ হলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে ম্যানেজ করে ৬ মাস সময় বৃদ্ধি নিয়ে পুনরায় কাজ শুরু করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত ৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার বন্ধের দাবিতে এলাকাবাসী বাধা দিলে সাব-ঠিকাদার ও তার সহযোগীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে স্থানীয়রা বাধ্য হয়ে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
অনিয়মের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর এলাকার আবুল কামাল, আলী আকবর, হাবিবুর রহমানসহ ৪৬টি পরিবার গণস্বাক্ষর সংযুক্ত করে জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগপত্রে তারা উল্লেখ করেন, বর্তমান উপকরণে কাজ চললে বর্ষা মৌসুম আসার আগেই সড়কের পিচ উঠে যাবে এবং বিপুল সরকারি অর্থের অপচয় হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা কালাম, মঞ্জু মিয়া, আরমান ও সোহেল বলেন, “রাস্তায় যে ইটের খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে, তা রোলার চালাতেই গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। মেকাডমে রাবিশের ওপর পিচ ঢেলে দায় সারা হচ্ছে। এভাবে কাজ হলে কয়েক মাসেই রাস্তা ধ্বংস হয়ে যাবে।”অটোরিকশা চালক মো. রুবেল বলেন, “রাস্তাটি দীর্ঘদিন খারাপ ছিল। এখন সংস্কারের নামে আবার লুটপাট হচ্ছে। কয়েক মাসের মধ্যেই এই রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।”
৯ জানুয়ারি ২০২৬, শুক্রবার সকালে পুনরায় অনিয়ম করে কাজ শুরু হলে এলাকাবাসীর বাধার মুখে উপজেলা এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী মতিয়ার ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একইদিন বিকেলে ঠিকাদার ও তার লোকজন আবারো এলাকাবাসীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ জনতা মিছিল নিয়ে উপজেলা পরিষদে যায়। তারা দ্রুত উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানান।
এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা নাসরিন, পানছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফেরদৌস ওয়াহিদসহ সংশ্লিষ্টরা খাগড়াছড়ি সদর ও পানছড়ি উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. রাজু আহম্মেদ-এর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো .রাজু আহম্মেদ বলেন, “বিটুমিন ও পাথর সরকারি নিয়ম অনুযায়ী রয়েছে। তবে মেকাডমে কোথাও ত্রুটি থাকতে পারে। বিষয়টি পুনরায় তদন্ত করে দেখা হবে।”
তিনি পুনঃপরিদর্শন ছাড়া কাজ শুরু না করার নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে ১০ জানুয়ারি ২০২৬, শনিবার সড়ক নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।

অনলাইন ডেস্কঃ 


















